The Justice Corner is a leading law firm in Bangladesh, offering specialized legal services to both local and international clients. We serve as trusted advisors to prominent businesses, companies, and banks.

Blog Details

দ্বিতীয় বিয়ে করার আইনি প্রক্রিয়া ও উত্তরাধিকার আইন আপনার যা জানা জরুরি

দ্বিতীয় বিয়ে করার আইনি প্রক্রিয়া ও উত্তরাধিকার আইন আপনার যা জানা জরুরি

বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিয়ের আইন কী? প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি বাধ্যতামূলক? অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে শাস্তি কী? জানুন মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের নিয়ম, শর্ত এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য।

 

বাংলাদেশে মুসলিম পুরুষদের জন্য বহুবিবাহ বা Second Marriage ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত হলেও রাষ্ট্রীয় আইনে এটি অবাধ নয়। অনেকেই মনে করেন, ইসলামে অনুমতি আছে তাই ইচ্ছে করলেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়। কিন্তু Muslim Family Laws Ordinance, 1961 অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া এবং শর্ত না মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব দ্বিতীয় বিয়ে করার নিয়ম ও শর্ত, অনুমতি ছাড়া বিয়ের শাস্তি এবং আনুষাঙ্গিক আইনি জটিলতা নিয়ে।

১. দ্বিতীয় বিয়ের আইনি ভিত্তি (Law of Multiple Marriage)

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রথম স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সালিশি পরিষদ (Arbitration Council)-এর লিখিত অনুমতি নিতে হবে। এই অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তা আইনিভাবে বৈধ হলেও স্বামী শাস্তির মুখোমুখি হবেন।

২. দ্বিতীয় বিয়ে করার নিয়ম ও শর্ত (Process & Conditions)

আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পেতে হলে স্বামীকে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:

  1. আবেদন (Application): স্বামীকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে।
  2. সালিশি পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান বা মেয়র একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবেন, যেখানে স্বামীর প্রতিনিধি এবং প্রথম স্ত্রীর প্রতিনিধি থাকবেন।
  3. যৌক্তিক কারণ: পরিষদ দেখবে দ্বিতীয় বিয়েটি কি "প্রয়োজনীয় এবং ন্যায়সঙ্গত" (Necessary and Just) কি না।

দ্বিতীয় বিয়ের অনুমোদনের গ্রহণযোগ্য কারণসমূহ:

  • প্রথম স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব (Sterility)।
  • শারীরিক অসামর্থ্য বা দুরারোগ্য ব্যাধি।
  • দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে স্ত্রীর অনাগ্রহ বা অক্ষমতা।
  • মানসিক ভারসাম্যহীনতা।

৩. দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি স্ত্রীর অনুমতি লাগে? (Does Wife’s Permission Matter?)

অনেকেই প্রশ্ন করেন, "দ্বিতীয় বিয়ে করতে কি স্ত্রীর অনুমতি লাগে?" আইনত, কেবল স্ত্রীর মৌখিক সম্মতি যথেষ্ট নয়। স্ত্রীর অনুমতি থাকলেও সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক। তবে সালিশি পরিষদ যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বা অসম্মতিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। প্রথম স্ত্রী যদি যৌক্তিক কারণে আপত্তি জানান, তবে পরিষদ অনুমতি নাও দিতে পারে।

৪. অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে কী হয়? (Penalty for Marriage Without Permission)

যদি কোনো ব্যক্তি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে (Second Marriage without permission) করেন, তবে তিনি আইনি জটিলতায় পড়বেন:

  • কারাদণ্ড ও জরিমানা: ১৯৬১ সালের আইনের ৬(৫) ধারা অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
  • দেনমোহর পরিশোধ: অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামী প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (তৎক্ষণাৎ প্রদেয় বা বিলম্বিত) পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।
  • দণ্ডবিধি (Penal Code): দণ্ডবিধির ৪৯৪ ও ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে বিয়ে করলে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

৫. বাংলাদেশে মুসলিমদের জন্য উত্তরাধিকার আইন কি? (Inheritance Law)

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী:

  • স্ত্রীর অংশ: স্বামী মারা গেলে স্ত্রীরা সম্পত্তির ১/৮ অংশ (সন্তান থাকলে) বা ১/৪ অংশ (সন্তান না থাকলে) পান।
  • একাধিক স্ত্রী থাকলে: যদি একাধিক স্ত্রী থাকেন, তবে তারা ওই ১/৮ বা ১/৪ অংশ নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। অর্থাৎ, নতুন স্ত্রী আসার কারণে প্রথম স্ত্রীর সম্পত্তির অংশ কমে যায়, কিন্তু তিনি বঞ্চিত হন না।

৬. কোর্ট ম্যারেজ বাতিল করার নিয়ম (Cancellation of Court Marriage)

অনেক সময় গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে বা কোর্ট ম্যারেজ করার পর তা বাতিল করতে চাওয়া হয়। মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশে "কোর্ট ম্যারেজ" বলতে সাধারণত নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামাকে বোঝানো হয়। কিন্তু আইনি বিয়ে হলো কাবিননামা রেজিস্ট্রেশন।

বাতিল প্রক্রিয়া: কেবল হলফনামা বা এফিডেভিট ছিঁড়ে ফেললে বিয়ে বাতিল হয় না। বিয়ে বাতিল বা শেষ করার একমাত্র আইনি পথ হলো তালাক (Divorce)। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে এবং ৯০ দিন সময় পার করার মাধ্যমেই কেবল বিয়ে বাতিল বা বিচ্ছেদ কার্যকর করা সম্ভব।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: আমি কি প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারব? উত্তর: না। প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে আপনি ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হবেন এবং জেল-জরিমানার সম্মুখীন হতে পারেন।

প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিয়ে কি রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক? উত্তর: হ্যাঁ। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিটি বিয়ে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন: দ্বিতীয় স্ত্রী কি প্রথম স্ত্রীর সমান অধিকার পাবেন? উত্তর: হ্যাঁ। ইসলামি শরিয়ত এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, স্বামীদের সকল স্ত্রীর প্রতি সমান ভরণপোষণ এবং আচরণ বজায় রাখতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে যেকোনো স্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।

 

দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশের Polygamy Law বা বহুবিবাহ আইন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। আবেগের বশে বা আইনের তোয়াক্কা না করে বিয়ে করলে তা আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য চরম আইনি ভোগান্তি বয়ে আনতে পারে। যেকোনো জটিলতায় একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।