The Justice Corner is a leading law firm in Bangladesh, offering specialized legal services to both local and international clients. We serve as trusted advisors to prominent businesses, companies, and banks.

Blog Details

নারীদের তালাক দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা

নারীদের তালাক দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা

নারীদের তালাক দেওয়ার ক্ষমতা  আইনি অধিকার ও পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক প্রদানের ক্ষমতা কেবল পুরুষদের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামী শরিয়ত নারীদের জন্যও বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট এবং সম্মানজনক পথ খোলা রেখেছে। একজন নারী চাইলেই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে এবং যথাযথ কারণ দর্শিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। নারীদের তালাক প্রদানের ক্ষমতা মূলত তিনটি প্রধান পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত—তালাক-ই-তৌফিজ, খুলা এবং আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ।

তালাক-ই-তৌফিজ: নারীর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার

একজন নারীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে সহজ এবং ঝামেলামুক্ত উপায় হলো 'তালাক-ই-তৌফিজ'। বিয়ের সময় যে নিকাহনামা বা কাবিননামা রেজিস্ট্রি করা হয়, তার ১৮ নম্বর কলামটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কলামে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা বা 'তৌফিজ' অর্পণ করেন, তবে স্ত্রী আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা বা স্বামীর অনুমতির অপেক্ষা ছাড়াই নিজেকে তালাক দিতে পারেন। এটি মূলত স্বামীর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রীর নিজের ওপর তালাক প্রয়োগ করা। তাই বিয়ের সময় এই ১৮ নম্বর ঘরটি পূরণ করা আছে কিনা, তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক নারীর জন্য জরুরি।

খুলা তালাক: পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিচ্ছেদ

যদি কোনো কারণে কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা না দেওয়া থাকে, তবুও বিচ্ছেদের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। এক্ষেত্রে 'খুলা তালাক' একটি কার্যকর পদ্ধতি। যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মধ্যেই বনিবনা হয় না, তখন স্ত্রী স্বামীর সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিতে পারেন। একে 'খুলা' বলা হয়। এই পদ্ধতিতে সাধারণত স্ত্রী তার প্রাপ্য মোহরানা বা অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা ত্যাগের বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ বা মুক্তি প্রার্থনা করেন। তবে মনে রাখা জরুরি, খুলা তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর সম্মতি থাকা আবশ্যক; স্বামী রাজি না হলে এই পদ্ধতিতে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়।

আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ (ফাসখ)

যখন কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা (তৌফিজ) থাকে না এবং স্বামীও খুলা তালাকে রাজি হন না, তখন স্ত্রী ১৯৩৯ সালের 'মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন'-এর অধীনে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। একে বলা হয় 'ফাসখ' বা বিচারিক বিচ্ছেদ। এই আইনের অধীনে একজন নারী বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। যেমন—স্বামী যদি ৪ বছর ধরে নিখোঁজ থাকেন, একটানা ২ বছর স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন, অথবা ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের জন্য কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া স্বামী যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, পুরুষত্বহীন হন, অথবা স্ত্রীর ওপর শারীরিক বা মানসিক নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেন, তবে আদালত স্ত্রীর পক্ষে বিচ্ছেদের ডিক্রি জারি করতে পারেন। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও নারীর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।

আইনি প্রক্রিয়া এবং নোটিশের গুরুত্ব

তালাক যে পদ্ধতিতেই দেওয়া হোক না কেন—তৌফিজ, খুলা বা আদালতের মাধ্যমে—তা কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন মানা বাধ্যতামূলক। ১৯সী১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, তালাক প্রদানের পর স্থানীয় সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এবং অপর পক্ষকে (স্বামীকে) লিখিত নোটিশ পাঠাতে হয়। এই নোটিশ পাঠানোর তারিখ থেকে ৯০ দিন পার হওয়ার পর তালাক আইনগতভাবে কার্যকর হয়। এই ৯০ দিন সময়কালকে 'ইদ্দতকাল' বলা হয়, যা আপোষ-মীমাংসার জন্য রাখা হয়েছে। মনে রাখবেন, যথাযথ নোটিশ এবং রেজিস্ট্রেশন ছাড়া তালাক আইনত সিদ্ধ হয় না এবং ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।