বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নিবন্ধনের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা ২০২৬
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা বর্তমানে অনেক সহজ হয়ে গেছে, তবে আইনি প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে জানা না থাকলে পরবর্তীতে জটিলতা হতে পারে। বাংলাদেশে কোম্পানি গঠন ও পরিচালনা মূলত ১৮৯৪ সালের কোম্পানি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (RJSC)।
The Justice Corner-এর পক্ষ থেকে উদ্যোক্তা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানি নিবন্ধনের সঠিক ও সহজ ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
কোম্পানি গঠনের প্রাথমিক শর্তাবলি
নিবন্ধন শুরু করার আগে নিচের আইনি শর্তগুলো পূরণ নিশ্চিত করুন:
- শেয়ারহোল্ডার: কমপক্ষে ২ জন এবং সর্বোচ্চ ৫০ জন।
- পরিচালক: কমপক্ষে ২ জন পরিচালক থাকতে হবে (যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি)।
- পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital): স্থানীয় কোম্পানির জন্য সর্বনিম্ন ১ টাকা হলেও চলে, তবে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী ভিসা ও লভ্যাংশ বিদেশে নেওয়ার সুবিধার্থে ৫০,০০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূলধন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
- নিবন্ধিত অফিস: বাংলাদেশে একটি বাস্তব এবং যাচাইযোগ্য অফিসের ঠিকানা থাকা বাধ্যতামূলক।
কোম্পানি নিবন্ধনের ধাপসমূহ (ধাপে ধাপে)
বর্তমানে RJSC-এর পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল বা অনলাইন ভিত্তিক। প্রধান ধাপগুলো হলো:
১. নামের ছাড়পত্র (Name Clearance)
আপনার পছন্দমতো একটি নাম নির্বাচন করে RJSC পোর্টালে আবেদন করতে হবে। নামটি ইউনিক হতে হবে।
- ফি: আবেদন প্রতি ২০০-৬০০ টাকা।
- মেয়াদ: নাম অনুমোদনের পর তা ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে।
২. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন জমা
প্রস্তাবিত কোম্পানির নামে একটি অস্থায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য: বিদেশ থেকে বিনিয়োগের টাকা এই অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে ব্যাংক থেকে ‘এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট’ সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। এটি কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আইনি নথি প্রস্তুত (MoA ও AoA)
কোম্পানির গঠনতন্ত্র বা সংবিধান হিসেবে পরিচিত এই দুটি দলিল ড্রাফট করতে হয়।
- মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (MoA): এখানে কোম্পানির উদ্দেশ্য ও ক্ষমতা উল্লেখ থাকে।
- আর্টিকল অফ অ্যাসোসিয়েশন (AoA): এখানে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও পরিচালনা পর্ষদের নিয়মাবলী থাকে।
দ্রষ্টব্য: এগুলো অবশ্যই নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করতে হবে।
৪. অনলাইনে আবেদন ও ফি জমা
RJSC পোর্টালে MoA, AoA এবং প্রয়োজনীয় ফরমসমূহ (Form I, VI, IX, X, XII) আপলোড করতে হবে। এরপর অনুমোদিত মূলধনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত সরকারি ফি ও স্ট্যাম্প ডিউটি জমা দিতে হবে।
৫. নিবন্ধন সনদ গ্রহণ
সব তথ্য ও ফি যাচাইয়ের পর RJSC নিচের ডকুমেন্টগুলো ইস্যু করবে:
- Certificate of Incorporation (নিবন্ধন সনদ)
- সত্যায়িত MoA এবং AoA
- Form XII (পরিচালকদের তালিকা)
নিবন্ধন পরবর্তী প্রয়োজনীয় লাইসেন্সসমূহ
কোম্পানি নিবন্ধন সনদ পেলেই ব্যবসা শুরু করা যায় না। আইনিভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরও কিছু লাইসেন্স প্রয়োজন:
| লাইসেন্সের নাম | প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ |
|---|---|
| ট্রেড লাইসেন্স | স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ |
| কোম্পানি ই-টিন (E-TIN) | এনবিআর (NBR) |
| ভ্যাট নিবন্ধন (BIN) | এনবিআর (NBR) |
| বিডা (BIDA) নিবন্ধন | বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জরুরি) |
কোম্পানি নিবন্ধনের আনুমানিক খরচ
নিবন্ধন ফি মূলত আপনার কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন (Authorized Capital)-এর ওপর নির্ভর করে।
- স্ট্যাম্প ডিউটি: ১০ লাখ টাকা মূলধন পর্যন্ত আনুমানিক ২,৫০০+ টাকা।
- সরকারি ফি: মূলধনের পরিমাণ অনুযায়ী এটি বৃদ্ধি পায়।
- মোট সরকারি খরচ: ছোট কোম্পানির ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে (পেশাদার কনসালটেন্সি ফি ব্যতীত)।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: কোম্পানি খুলতে সর্বনিম্ন কতজন মানুষ লাগে?
উত্তর: একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির জন্য কমপক্ষে ২ জন শেয়ারহোল্ডার এবং ২ জন পরিচালক প্রয়োজন।
প্রশ্ন ২: কোম্পানি নিবন্ধন করতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে এবং অনলাইনে আবেদন করার পর সাধারণত ৩ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
প্রশ্ন ৩: বিদেশি নাগরিক কি বাংলাদেশে ১০০% মালিকানায় কোম্পানি খুলতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, অধিকাংশ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১০০% মালিকানায় কোম্পানি গঠন করতে পারেন।
The Justice Corner-এর পরামর্শ
কোম্পানির MoA (Objects Clause) ড্রাফটিং অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভুলভাবে উদ্দেশ্য লিখলে ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সমস্যা হতে পারে। তাই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে আপনার কোম্পানির আইনি ভিত্তি মজবুত করা বুদ্ধিমানের কাজ।
আপনার ব্যবসার সঠিক ও ঝামেলামুক্ত নিবন্ধনের জন্য আজই যোগাযোগ করুন The Justice Corner-এ।
